বীমার নীতিমালা [ Principles of Insurance ]

বীমার নীতিমালা

[ Principles of Insurance ]

বীমার নীতিমালা [ Principles of Insurance ]

বীমার নীতিমালা

আর্থ-সামাজিক প্রায় প্রতিটি ব্যবস্থা ও বিষয়েরই থাকে নিজস্ব নীতিমালা। বীমা ব্যবস্থা সংগতকারণেই তার কোন ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ, বীমা ব্যবস্থারও বেশ কিছু অনুসৃত নীতিমালা রয়েছে। এম.এন. মিশ্র বীমার দু’টি নীতির উল্লেখ করেছেন। যথাঃ (১) সহযোগিতা বা সমবায়ের নীতি এবং (২) সম্ভাব্যতার নীতি। বিশিষ্ট গ্রন্থকার এ. এইচ. চৌধুরী তার “Elements of Insurance” গ্রন্থে বীমার ছয়টি নীতির কথা বলেছেন। নিম্নে সেগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো : –

১. চূড়ান্ত সদ্বিশ্বাসের নীতি (Principle of utmost good falth):

বীমাচুক্তির একটি অন্যতম মৌলিক উপাদান তথা বীমা ব্যবস্থার একটি অন্যতম মূল নীতি হচ্ছে – চুড়ান্ত সদ্বিশ্বাস। বীমাচুক্তিতে বীমাকারী আর্থিক ক্ষতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা দিয়ে থাকেন এবং ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন বীমাগ্রহীতা কর্তৃক প্রদত্ত নিৰ্দ্দিষ্ট সেলামীর প্রতিদানে। এরূপ কোন গুরু দায়ভার তথা ঝুঁকি গ্রহণের জন্যে স্বভাবতঃই সর্বাধিক বিশ্বাস রক্ষা করে তথ্য পরিবেশন করা একান্ত অপরিহার্য।

একারণেই বীমাচুক্তি গঠনে কোন কিছু যেমন বাড়িয়ে বলা যাবে না, তেমনি কোন কথা গোপন করাও যাবে না; তাহলে চুক্তিই রদ বা বাতিল হয়ে যাবে। তাই এখানে যে কথা বলা প্রয়োজন তা না জিজ্ঞেস করতেই বলে দিতে হবে। কিন্তু অন্যান্য অনেক চুক্তিতেই তা বলতে হয় না।

যেমনঃ পণ্যবিক্রয় চুক্তিতে সাধারণতঃ ক্রেতা পণ্যের ভালোমন্দ না জানতে চাইলে বিক্রেতা সে সম্পর্কে বলতে বাধ্য নন। বীমাচুক্তিতে বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতা একে অপরের সাথে চূড়ান্ত সদ্বিশ্বাস রক্ষা করে পারস্পরিকভাবে চুক্তি গঠন, সম্পাদন ও সম্পন্ন করবেন। বিশেষতঃ বীমাগ্রহীতার বর্ণনা ও বক্তব্যের উপর বিশ্বাস করেই বীমাকারী ঝুঁকি গ্রহণ করে থাকেন। এ জন্যেই বীমাচুক্তিকে চূড়ান্ত সম্বিশ্বাসের চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়।



২. বীমাযোগ্য স্বার্থের নীতি (Principle of Insurable Interest) :

জীবন ও সম্পদ-সম্পত্তির উপর মানুষের স্বার্থ থাকে বটে; কিন্তু, যে কোন জীবন বা সম্পদ-সম্পত্তির উপর যে কোন ব্যক্তিরই স্বার্থ থাকে না। যেমনঃ– নিজের জীবনের উপর নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের অথবা আর্থিক সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের পরস্পরের জীবনের উপর পরস্পরের স্বার্থ বিদ্যমান থাকে। আবার, কোনো সম্পদ-সম্পত্তির উপর সাধারণতঃ ইহার স্বত্বাধিকারীর স্বার্থ নিহিত থাকে। অর্থাৎ, স্বার্থ নেই — এমন কোন মানুষের জীবনের উপর অথবা অন্যের সম্পদ সম্পত্তির উপর বীমা করা যাবে না। কেননা, তার উপর বৈধ স্বত্ব বা স্বার্থ থাকে না। এবং এ কারণেই তা বীমাযোগ্য স্বার্থ নয়। বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকাই বীমাগ্রহণের পূর্বশর্ত। তাই বীমা ব্যবস্থায় বীমাযোগ্য স্বার্থের নীতি অনুসরণ করা হয়।

৩. ক্ষতিপূরণের নীতি (Principle of Indemnity) :

জীবন বীমার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটলে বা বীমাচুক্তির মেয়াদান্তে বীমাকারী বীমাগ্রহীতার দাবী পূরণ করে থাকেন; পক্ষান্তরে, সম্পত্তি বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত কারণ (দুর্ঘটনা) সংঘটনের জন্যে সৃষ্ট ক্ষতি পূরণ করে দেয়ার নীতি অনুসৃত হয়ে থাকে।

৪. স্থলাভিষিক্ততার নীতি (Principle of Subrogation) :

সম্পত্তি বীমার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা সংঘটনের ফলে, সামগ্রিক ক্ষতিসাধিত হলে বীমাকারী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্যক ক্ষতিপূরণ করে দিলে এবং তারপর তা থেকে কিছু উদ্ধার করা গেলে সঙ্গতঃ ও বিধিগত কারণেই তার মালিকানা বা অধিকার লাভ করেন বীমাকারী। অর্থাৎ, পূর্বেকার মালিকের (বীমাগ্রহীতার) স্থলে এখন বীমাকারীই উক্ত উদ্ধারযোগ্য বা উদ্ধারকৃত সম্পদ-সম্পত্তির মালিকানায় অভিষিক্ত হন। যে নীতির ভিত্তিতে এটি করা হয়ে থাকে, তাকেই বলা হয় স্থলাভিষিক্ততার নীতি। [স্থলাভিশিক্ততার নীতি প্রসঙ্গে পরে আরও বর্ণনা দেয়া হয়েছে।]

৫. অংশগ্রহণের নীতি (Principle of Contribution) :

এই নীতিটি মূলতঃ ক্ষতিপূরণের নীতির অনুগামী এবং স্থলাভিষিক্ততার নীতির সমগামী। কেননা, ক্ষতিপুরণের নীতিতে উক্ত রয়েছে যে – ক্ষতি সংঘটনের পর বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ দানের মাধ্যমে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন – যেন মনে হয় কোন ক্ষতিই সংঘটিত হয়নি। একথায় স্পষ্ট যে, বীমাগ্রহীতা সচরাচর ক্ষতির চেয়ে কমও পাবেন না, বেশীও পাবেন না। কিন্তু, কেউ অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ক্ষতিপুরণের নীতির বরখেলাপ করে অধিক লাভের চেষ্টা করতে পারেন। স্থলাভিষিক্ততার নীতির মতই তাই অংশগ্রহণের নীতিকে ক্ষতিপূরণের নীতি রক্ষা করে চলতে হবে বা অনুগামী হতে হবে।

আরার, একই সম্পদ-সম্পত্তির জন্যে যদি একাধিক বীমা প্রতিষ্ঠানে বীমা করা হয়, তাহলেও বীমাগ্রহীতা ক্ষতির চেয়ে বেশী আদায় করতে পারবেন না; বরং সেক্ষেত্রে সহ-বীমাকারীগণ দাবী পরিশোধে আনুপাতিক হারে অংশগ্রহণ করবেন) যে বীমাকারীর কাছ থেকে যত টাকার বীমাপত্র ক্রয় করা হয়েছে, এনীতিতে তদনুপাতে অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে)। এর অর্থ হচ্ছে এই, যেন বীমাগ্রহীতা তার উপর সৃষ্ট ক্ষতির চেয়ে অধিক লাভ করতে না পারেন। বীমার ক্ষেত্রে অনুসৃত এ নীতিকেই বলা হয় ( আনুপাতিক) অংশ গ্রহণের নীতি।



৬. ক্ষতির অব্যবহিত কারণ নীতি (Principle of Proximate Cause or Causa Proxima):

ক্ষতি সংঘটিত হলেই ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় না। কারণ, ক্ষতি সংঘটিত বা সাধিত হতে পারে নানাবিধ কারণে। আর, বীমা প্রতিষ্ঠানও নানা রকম বিপদ-বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বীমাপত্র বিক্রয় করে থাকে। বীমাকারী ক্ষতিপূরণ করে দিতে তখনই দায়বদ্ধ বা বাধ্য, যখন প্রকৃতপক্ষে যে কারণে ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে সে কারণটির বিরুদ্ধে বীমা করা থাকে। অন্য কোন কারণে ক্ষতি হলে, বীমাকারী ক্ষতিপূরণ প্রদান করবেন না। বীমা ব্যবস্থায় অনুসৃত এই নীতিই হচ্ছে – ক্ষতির অব্যবহিত বা নিকটতম কারণ নীতি তথা মতবাদ (Principle or Doctrine of Causa Proxima) |

উপরোক্ত নীতিসমূহ ছাড়াও কতিপয় নীতি সম্পর্কে কোন কোন গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন এবং কিছু কিছু বিষয় উক্ত নীতিগুলির আনুষঙ্গিক বলে কেউ কেউ মনে করেন বিধায় সেগুলি সম্পর্কেও নিম্নে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো।

ক. সমবায় বা সহযোগিতার নীতি (Principle of ‘Co operation) :

পারস্পরিক সহযোগিতার মনোবৃত্তি ও কর্মতাৎপরতা থেকেই প্রকৃতপক্ষে বীমা ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। আজও তাই সে নীতি পরোক্ষভাবে হলেও বীমার ক্ষেত্রে বিদ্যমান রয়েছে। কেননা, একজনের বিপদ-বিপর্যয়ে বা প্রয়োজনে একই শ্রেণীর অন্যান্য বীমাগ্রহীতাদের সঞ্চিতি থেকেই দাবী বা ক্ষতিপূরণ করে দেয়া হয়ে থাকে।

(খ) সম্ভাবনা বা সম্ভবতা তথা সম্ভাব্যতার নীতি (Principle of Probability):

বীমা ব্যবসায়ের যাবতীয় কার্যক্রমের একটি প্রধান ভিত্তি হলো সম্ভাব্যতা। কেননা, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং বর্তমানের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে কি পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে বা কতটা ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে, বীমাকৃত জীবনের বার্ষিক মৃত্যুর হার কত হতে পারে ইত্যাদির উপর নির্ভর করেই বীমা কিস্তি বা সেলামী নিৰ্দ্ধারিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে। আবার, যে বিপদ-বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বীমা করা হয় তা সংঘটিত হতেও পারে নাও হতে পারে; এটিও এক প্রকার সম্ভাব্যতার বিষয়। সুতরাং, এ থেকে বলা যায় যে, সম্ভাব্যতার বীমার একটি অন্যতম অনুসৃত নীতি।

(গ) বিপুল সংখ্যার নীতি বা বিধি (Principle or Law of Large Number):

বীমাকারীগণ বীমাপত্র বিক্রয়ের সময় অবশ্যই দেখে নেন যে বিষয়বস্তুর উপর বীমা করা হচ্ছে, তার পরিমাণ বা সংখ্যা বেশী কিনা। বেশী না হলে বীমাকারী সে বিষয়ে বীমাপত্র বিক্রয় করেন না। কেননা, বীমাকারীগণ দেখেছেন যে, বিষয়বস্তু খুব কম সংখ্যক হলে এবং সেক্ষেত্রে ক্ষতি সংঘটিত হলে, ক্ষতিপূরণের জন্যে সেলামী হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের পুরোটাই অথবা ততোধিক অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তাই, বীমাকারী এ ধরনের বীমাচুক্তিতে যান না।

যেমনঃ – একই বয়ঃক্রমের অনেক মানুষ অথবা একই ধরনের অনেক সম্পদ বা বিষয়বস্তু থাকলেই তার উপর বীমাকারী নির্দ্বিধায় বীমাপত্র দিয়ে থাকেন; পক্ষান্তরে, আনবিক চুল্লীর মত কোন বিষয়বস্তু কোন দেশে খুবই কম সংখ্যক হয়ে থাকে বিধায় এ বিষয়ে বীমাকারীগণ বীমাপত্র বিক্রয় করতে আগ্রহী হন না বা বিক্রয় করেন না। সুতরাং, এটিকেও বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম অনুসৃত নীতি হিসেবে গণ্য করা হয়।



উপরন্তু, বীমার প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবসায়িক নীতি হিসেবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি প্রনিধানযোগ্য। যেমনঃ
(1) সেবাদান নীতি
(11) বিনিয়োগের নীতি;
(111) সঞ্চয় সৃষ্টির নীতি;
(iv) আর্থিক কার্যাবলী (দাতব্য বা দ্যূতক্রীড়া বিষয়ক নয়) সম্পাদনের নীতি ইত্যাদি।

অনুসিদ্ধান্তে, বলা প্রয়োজন যে – নীতি, বিধি, মতবাদ, প্রকৃতি, কার্যাবলী ইত্যাদি বিষয়গুলি এতই কাছাকছি যে এসব বিষয়ে মতভেদের প্রচুর অবকাশ থাকা স্বাভাবিক এবং এগুলি যথেষ্ট পর্যালোচনা ও গবেষণা সাপেক্ষও বটে। বীমার ক্ষেত্রেও তাই বিদগ্ধ লেখক ও গবেষকগণ নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। এতদ্সত্ত্বেও চুড়ান্ত কিছু আমাদের সেরা ব্যক্তিটির কাছেও দুর্ভেয়ই থেকে যায়। কেননা, এযে এক অন্তহীন পথচলা।

আরও পডুন:

বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ [ Basic & General Contents of Insurance ]

Leave a Comment