বীমার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত ও বাংলাদেশে বীমার বর্তমান ধারা [ Brief History of Insurance & The Present Pattern of Insurance in Bangladesh ]

বীমার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত ও বাংলাদেশে বীমার বর্তমান ধারা

[ Brief History of Insurance & The Present Pattern of Insurance in Bangladesh ]

বীমার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত ও বাংলাদেশে বীমার বর্তমান ধারা [ Brief History of Insurance & The Present Pattern of Insurance in Bangladesh ]

বীমার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত ও বাংলাদেশে বীমার বর্তমান ধারা:

সীমাহীন পরিব্যাপ্ত – অনন্ত দীর্ঘ বয়স্ক এ মহাবিশ্বের একটি অতি ক্ষুদ্র গ্রহ আমাদের এ পৃথিবীটাই যে কতকালের পুরোনো – সেটাই যেখানে নিশ্চিত নয়, সেখানে সভ্যতার পত্তন ও পরিবর্তন এবং তারই মাঝে বীমার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিবৃত্ত, ধারা ইত্যাদি সম্পর্কে নিশ্চয় করে কিছু বলা সন্দেহাতীতভাবে দুরুহ। তবে, নিকট অতীত থেকে অদ্যাবধি সংগৃহীত কিছু ইতিবৃত্ত বিভিন্ন গ্রন্থকার, বিশেষজ্ঞ ও লেখক উপস্থাপন করেছেন।

তাতে দেখা যায়, সভ্যতার এ পর্যায়ে ভূমধ্য সাগরের উত্তর অঞ্চলে বিশেষতঃ ইটালীকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় কিছু দেশে খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে বীমা ব্যবসায়ের গোড়াপত্তন হয়। তারপর, ক্রমাগতভাবে সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে গ্রেটবৃটেনকে কেন্দ্র করে ইউরোপে যে শিল্প বিপ্লব সংঘঠিত হয়, তার ফলশ্রুতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব প্রসারতার সাথে সাথে বীমা ব্যবসায়ের প্রতিষ্ঠা ও ক্রমসম্প্রসারণ তরান্বিত হয়।

ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের সাথে কালক্রমে যে ব্যবসায়ীক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণ করতে থাকে তারই প্রেক্ষিতে সংঘটিত বিপদ ও বিপর্যয় মোকাবেলার তাগিদে বীমা ব্যবসায় ইউরোপে এবং সাথে সাথে অন্যান্য দেশেও বিস্তার লাভ করতে থাকে। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য আমেরিকাসহ পৃথিবীর বহুদেশে সম্প্রসারিত হয় এবং আমাদের এ উপমহাদেশেও বিস্তার লাভ করে। তবে, তৎকালীন বীমা ব্যবসা মূলতঃ সমবায় পন্থায় উৎপত্তি লাভ করে এবং চালু হতে থাকে।



প্রায় সকল লেখক, গ্রন্থকার ও বিশেষজ্ঞদের মতেই নৌ-বীমা প্রথম উৎপত্তি লাভ করে – ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। তবে, খৃষ্টপূর্ব বহুশতাব্দী (৪/৫ হাজার বছর) আগেও মানব সভ্যতায় সমবায় পন্থায় পরস্পর পরস্পরের বিপদ ও বিপর্যয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রমাণ আর্য ও সিন্ধু সভ্যতাসহ অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতায় পাওয়া যায়। আর, তা বিশেষতঃ অগ্নিজনিত ও জীবন সংক্রান্ত বিপর্যয় বা ক্ষতি মোকাবেলা অথবা পুরণ করার ক্ষেত্রেই হয় প্রথম – এ অভিমতও একেবারে ভিত্তিহীন নয়।

যাই হোক, উৎকর্ষতা ও ব্যাপকতায় নৌ-বীমাই যে প্রথম এবং সমধিক আত্মপ্রকাশ লাভ করে সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। নৌ-বীমার পত্তন ও প্রসারের পর পরই ১৬৬৬ সালে লণ্ডনে এক ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড এবং ১৮৬১ সালে টালি ষ্টেটের অগ্নিকাণ্ডই মূলতঃ বৃটেনে প্রথম (১৮৬৫ সালে) সংগঠিত ও সংবিধিবদ্ধ অগ্নিবীমার প্রবর্তনে সহায়ক হয় এবং ১৯০০ সালে তা আরও সংহত হয়। এর পরে জীবন বীমারও প্রবর্তন হতে থাকে। ইংল্যান্ডে ১৮৯৬ সালে – Hand in Hand নামে প্রথম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়।

Car Insurance



কিন্তু, আমাদের এ উপমহাদেশে একটু বিপরীত ধারায়ই প্রথমে জীবন বীমা – তারপরে অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত হয়। এ উপমহাদেশে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতেই সর্বপ্রথম কতিপয় ইউরোপীয় উদ্যোক্তা, ১৮১৮ সালে “দি ওরিয়েন্ট লাইফ এ্যাসিওরেন্স কোম্পানী” নামে একটি জীবন বীমা সংস্থার গোড়াপত্তন করেন। তারপর, জীবন বীমার উপর ১৮৭০-৭১ সালের দিকে – “Bombay Mutual Life Assurance Society. Oriental Govt. Security Life Assurance co. Ltd. ইত্যাদি অনেক জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান শুরু হতে থাকে।

এরপর ক্রমবিকাশের ধারায়, বীমার প্রকৃতি ও প্রকারভেদ হতে থাকে বিভিন্ন ও ব্যাপকতর। ফলে, বিভিন্ন ধরনের বীমা প্রতিষ্ঠানও যেমন হতে থাকে তেমনি বিভিন্ন ধরনের বীমাচুক্তি বা বীমাপত্রও উন্মেষ লাভ করতে থাকে। যেমন : – জীবন বীমা, নৌ ও অগ্নিবীমার সাথে সাথেই বিভিন্ন প্রকার সামাজিক বীমা ও অন্যান্য বেশ কিছু বীমা ব্যবস্থার প্রচলন হতে থাকে। একাধারে, ব্যক্তিগত বীমা (Individual Insurance), পারস্পরিক সংস্থা বা কোম্পানী (Matual Companies). সমবায় বীমা প্রতিষ্ঠান (Co-operative Insurance) ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বীমা ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে।

উক্ত বিভিন্ন ধরনের বীমা প্রতিষ্ঠানকে প্রাচীন ও আধুনিক—এ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যেহেতু, বীমা ব্যবসায়ের একটি উন্নত পর্যায়ে, বাংলাদেশ জন্ম লাভ করেছে এবং তৎকালীন পাকিস্তানও, সে কারণে এখানে আধুনিক বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আমাদের দেশে প্রায় সব ধরনের বীমাই চালু হয়েছে। অর্থাৎ, বীমা ক্রমোন্নতি লাভ করে চলেছে।

Insurance Home Insurance House Home Property

আমাদের এ উপমহাদেশে Clauson Committee-র প্রতিবেদনানুযায়ী প্রথম ১৯২৮ সালে The Indian Insurance Companies Act.’ নামে একটি বীমা আইন প্রণীত হয় এবং তা ১৯৩৮ সালে সংশোধিত, পরিমার্জিত ও সংযোজিত হয়ে পুনরায় ঘোষিত হয়।

১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির পরে তৎকালীন পাকিস্তানে উক্ত আইনই কার্যকর থাকে। তবে, ১৯৫৪ ও ৫৮ সালে তার কিছুটা রদবদল হয়। কিন্তু, ভারতে ১৯৫৭ সালেই বীমা ব্যবসায় রাষ্ট্রায়ত্ত করা হলেও পাকিস্তানে ব্যক্তিমালিকানায়ই থেকে যায়।

অতঃপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বীমার ক্ষেত্রে একটি নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ৮ই-আগষ্ট রাষ্ট্রপতির ১৫ নং আদেশে দেশের সব বীমা প্রতিষ্ঠানগুলিকে জাতীয়করণ করা হয়। উক্ত আদেশ বলে দেশের ৭৫টি বীমা প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে পাঁচটি সংস্থায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। যথাঃ – –

(১) বাংলাদেশ জাতীয় বীমা কর্পোরেশন

(২) কর্ণফুলী বীমা কর্পোরেশন

(৩) তিস্তা বীমা কর্পোরেশন

(৪) সুরমা জীবন বীমা কর্পোরেশন

(৫) রূপসা জীবন বীমা কর্পোরেশন।

পরবর্তীতে ১৪ই-মে, ‘৭৩-এ “বীমা কর্পোরেশন অধ্যাদেশ “(Insurance Corporation Ordinance, 1973)7 ঘোষণার মাধ্যমে উক্ত পাঁচটি সংস্থাকে সরকার দু’টি সংস্থার অন্তর্ভূক্ত করেন। জীবন বীমা সংস্থা দু’টিকে “জীবন বীমা কর্পোরেশন”-এর অধীনে এবং অন্যান্য সকল ধরনের বীমা এবং অপর বীমা সংস্থা তিনটিকে “সাধারণ বীমা কর্পোরেশন”-এর অধীনে নিয়ে আসা হয়।

 

 

এখনও রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা কর্পোরেশনদ্বয় যথারীতি চালু রয়েছে এবং সাধারণ বীমা কর্পোরেশন লাভজনকভাবেই চলছে। জীবন বীমার ক্ষেত্রে গ্রাহক সাধারণের উপর যেমন বাধ্যবাধকতা আরোপে অসুবিধা রয়েছে, তেমনি অন্যান্য বেশ কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও অন্তরায় রয়েছে বিধায় জীবণ বীমা কর্পোরেশনকে কিছুটা সমস্যার সাথে মোকাবেলা করেই এগুতে হচ্ছে।

তবে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও সংহত করা সম্ভব হলে এবং পূর্বশর্ত হিসেবে সৎ ও আন্তরিক নীতি, কর্মপন্থা এবং কর্মপ্রচেষ্টা থাকলে অবশ্যই রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানায় জীবন বীমা লাভবান প্রতিষ্ঠান হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পারে। কিন্তু, পাশাপাশি বেশ কিছু দিন আগে থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যক্তি মালিকানায় আনয়ন বা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়ে আসছিল যার ফল পরবর্তীতে প্রকাশ লাভ করেছে ভিন্নভাবে হলেও। অর্থাৎ, ইতিমধ্যেই জীবন বীমা ও সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন বীমা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যবসায় পরিচালনা করছে : –

(১) বাংলাদেশ জেনারেল ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Bangladesh General Insurance Co. Ltd.).

(২) পিপলস ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Peoples Insurance Co. Ltd.).

(৩) গ্রীণ ডেল্টা ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Green Delta Insurance Co. Ltd.).

(8) বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (Bangladesh Co-operative Insurance Co. Ltd.).

(৫) ইউনাইটেড ইনসিওরেন্স কোং লিঃ (United Insurance Co. Ltd.).

(৬) সিটি জেনারেল ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The City General Insurance Co. Ltd.).

(৭) পপুলার ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Popular Insurance Co. Ltd.).

(৮) প্রগতি জেনারেল ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (Pragati General Insurance Co. Ltd.).

(৯) কর্ণফুলী ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ, (Karnaphuli Insurance Co. Ltd.).

(১০) জনতা ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (Janata Insurance Co. Ltd.).

(১১) ইষ্টল্যাপ্ত ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Eastland Insurance Co. Ltd.).

(১২) ফেডারেল ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ ( The Federal Insurance Co. Ltd.).

(১৩) রূপালী ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (Rupali Insurance Co. Ltd.).

(১৪) ইষ্টার্ণ ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Eastern Insurance Co. Ltd.).

(১৫) পূরবী ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (Purabi Insurance Co Ltd.).

(১৬) সেন্ট্রাল ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The The Central Insurance Co. Ltd.).

(১৭) ফীনিকস ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (Phoenix Insurance Co. Ltd)

(১৮) রিলায়েন্স ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Reliance Insurance Co. Ltd)।

জীবন বীমার ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যবসা পরিচালনা করছে :

(১) ন্যাশনাল লাইফ ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The National Life Insurance Co. Ltd.).

(২) ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোং লিঃ (The Delta Life Insurance Co. Ltd.) ও

(৩) সন্ধানী লাইফ ইন্সিওরেন্স কোং লিঃ (The Sandhani Life Insurance Co. Ltd.)

উক্ত আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানার পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানায়ও বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বীমা প্রতিষ্ঠান কাজ করে চলছে। অর্থাৎ, একাধারে দু’টি ধারাই প্রবহমান যা মূলতঃ মিশ্র অর্থনীতিরই ফলশ্রুতি। তবে, এখন আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হচ্ছে অর্থনীতির সুস্থাবস্থার জন্যেই রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী রাখা এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলিরও অনুকূল বহমান ধারা হিসেবে জাতীয় সমৃদ্ধিতে অবদান রাখা।

[ “Insurance” শব্দটির বাংলা উচ্চারণ বা লিখন প্রকৃতপক্ষে ‘ইন্সিওরেন্স। কোথাও কোথাও ‘ইন্সিওরেন্স’ বা ‘ইন্দিওরেন্স’ অথবা ‘ইন্সিওরেন্স’ ইত্যাদি লেখা হয়ে থাকে। তবে, এখানে কথ্য প্রয়োগে ‘ইন্সিওরেন্স’ করা হয়েছে। ]

 

আরও পড়ুন:

Leave a Comment